রেইস ম্যানেজমেন্টের পক্ষে হাইকোর্টের একাধিক আদেশ, বিএসইসির অনুসন্ধান অবৈধ ঘোষণা

মিউচুয়াল ফান্ডের কার্যক্রমে বিধিনিষেধ নিয়ে আইনি লড়াই; আইসিবির আবেদনে স্থগিতাদেশ দেননি আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত
বাংলাদেশ রেইস ম্যানেজমেন্ট পিএলসির পরিচালিত বিভিন্ন মিউচুয়াল ফান্ডের কার্যক্রম ও লেনদেনসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে একাধিক আইনি লড়াইয়ে আদালতের আদেশ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) একটি অনুসন্ধানকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। অন্যদিকে, ফান্ডগুলোর লেনদেনে বিধিনিষেধ আরোপ এবং ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন বন্ধ রাখার নির্দেশনা নিয়ে দায়ের করা পৃথক রিটেও অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিকার পেয়েছে রেইস।
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে আদালতের আদেশের ফলে তাদের পরিচালিত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর কার্যক্রমসংক্রান্ত বিরোধে আইনি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিএসইসির অনুসন্ধান অবৈধ ঘোষণা
২০২৪ সালের ৬ জুন বিএসইসির জারি করা একটি অনুসন্ধানসংক্রান্ত আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে রেইস ম্যানেজমেন্ট। রিট পিটিশন নম্বর ৯৮৫৯/২০২৪-এর আবেদনে প্রতিষ্ঠানটির যুক্তি ছিল, নতুন অনুসন্ধানে এমন কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো আগের নিয়ন্ত্রক পরিদর্শন ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যে পর্যালোচনা করা হয়েছিল।
আবেদনটির শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। পরে বিএসইসি আদেশটির বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের দ্বারস্থ হয়। এ-সংক্রান্ত সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নম্বর ২৯৯৫/২০২৪ হলেও আপিল বিভাগ হাইকোর্টের দেওয়া স্থগিতাদেশে হস্তক্ষেপ করেননি বলে রেইসের দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে, ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট ওই রিটে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে বিএসইসির অনুসন্ধানকে আইনবহির্ভূত, আইনগত কর্তৃত্বহীন ও আইনগত কার্যকারিতাবিহীন বলে ঘোষণা করা হয়।
মিউচুয়াল ফান্ডের কার্যক্রমে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার
বিএসইসির অনুসন্ধানসংক্রান্ত বিরোধের পর রেইস পরিচালিত কয়েকটি মিউচুয়াল ফান্ডের ব্যাংক হিসাব, বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব, ব্লক মার্কেটে লেনদেন এবং অন্যান্য কার্যক্রমে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বিভিন্ন স্মারকের মাধ্যমে এসব বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছিল বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
এসব পদক্ষেপের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রেইস রিট পিটিশন নম্বর ৯৯৯৩/২০২৪ দায়ের করে। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট হাইকোর্ট এ মামলায় বিধিনিষেধসংক্রান্ত আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করেন।
পরবর্তী সময়ে, ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর আপিল বিভাগ বিএসইসির করা সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নম্বর ২৯৯৬/২০২৪-এ অনুমতি না দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া প্রতিকার বহাল রাখেন।
রেইসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আদালতের অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসি ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি একটি স্মারকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে। পরে ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট হাইকোর্ট রিটটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আগের স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ান।
আইসিবির নির্দেশনা নিয়ে আপিল বিভাগে স্থিতাবস্থার আদেশ
রেইস ম্যানেজমেন্টের পরিচালিত ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ডের লেনদেনসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে নতুন করে আইনি বিরোধ তৈরি হয় ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর। ওই দিন ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) কিছু নির্দেশনা জারি করে, যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ছয়টি ফান্ডের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন বা ডেবিট লেনদেন বন্ধ রাখতে ওয়ান ব্যাংক পিএলসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
আইসিবির এসব নির্দেশনার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রেইস ২০২৬ সালে রিট পিটিশন নম্বর ২৯৫০/২০২৬ দায়ের করে।
রিটের শুনানি শেষে ২০২৬ সালের ১২ মার্চ হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেন এবং আইসিবির সংশ্লিষ্ট স্মারকগুলোর কার্যকারিতা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেন।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আইসিবি সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নম্বর ১১২১/২০২৬ দায়ের করে স্থগিতাদেশ চাইলেও আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত ২০২৬ সালের ৬ জুলাই সেই আবেদন মঞ্জুর করেননি। পরিবর্তে, মামলার বিষয়বস্তু নিয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার (Status Quo) নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালতের এই নির্দেশের ফলে মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে বিদ্যমান অবস্থা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।
মিউচুয়াল ফান্ডের কার্যক্রমে প্রভাব
রেইস পরিচালিত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর কার্যক্রম, ব্যাংক হিসাব এবং লেনদেনের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ নিয়ে ধারাবাহিক আইনি পদক্ষেপের ফলে সংশ্লিষ্ট ফান্ডগুলোর পরিচালনা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
তবে বিভিন্ন মামলায় আদালতের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ, রুলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং আপিল বিভাগের আদেশের আইনগত প্রভাব এক নয়। বিশেষ করে আইসিবি-সংক্রান্ত মামলায় স্থিতাবস্থার নির্দেশকে মামলার চূড়ান্ত রায় হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং আদালতের আদেশের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পর্যালোচনার মাধ্যমে এসব নির্দেশনার সুনির্দিষ্ট পরিধি ও কার্যকারিতা আরও স্পষ্ট হবে।
প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় পরামর্শ: প্রতিবেদনটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট রিটের রায় ও আদেশের অনুলিপি, আপিল বিভাগের আদেশ এবং বিএসইসির বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের স্মারক যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ৬ জুলাইয়ের স্থিতাবস্থার আদেশটি আইসিবির নির্দেশনা সম্পূর্ণ বাতিল করেছে—এমন অর্থ যেন প্রতিবেদনে না দাঁড়ায়; প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী আদালত চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে বলেছেন।













