সম্পদ নিরাপদ থাকার প্রত্যয়নের পরও রেইসকে ঘিরে অপপ্রচারের অভিযোগ

আইসিবি ও ব্র্যাক ব্যাংকের কাস্টোডিয়ানে থাকা প্রায় ১,৯৯৭ কোটি টাকার সম্পদ যাচাইয়ের দাবি

 

বাংলাদেশ রেইস ম্যানেজমেন্ট পিএলসির ব্যবস্থাপনায় থাকা মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে তহবিলের দুর্বল পারফরম্যান্স, সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, সম্পদ আত্মসাৎ এবং বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার অভিযোগ।

তবে রেইস ম্যানেজমেন্টের দাবি, ২০২৫ সালে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এবং ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির পক্ষ থেকে তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ নিরাপদ ও অক্ষত থাকার বিষয়টি প্রত্যয়ন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সম্পদের হিসাব ও নিরাপত্তা নিয়ে পরিচালিত যাচাইয়েও কোনো ঘাটতি পাওয়া যায়নি।

রেইসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইসিবি রেইস পরিচালিত ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি ও কাস্টোডিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। এগুলো হলো—EBL1STMF, TBL1STMF, 1STJANATAMF, IFIC1STMF, FIRST BANGLADESH FIXED INCOME FUND এবং EXIM1STMF।

আইসিবির ৩১ মার্চ ২০২৫ তারিখের অডিট প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে রেইস জানিয়েছে, এসব ফান্ডের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা প্রায় ১ হাজার ২৭৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকার সম্পদ যাচাই ও হিসাবভুক্ত রয়েছে।

অন্যদিকে, 1STPopularlifeMF, PHP1STMF, ABBANK 1STMF এবং EBLNRBMF—এই চারটি ফান্ডের কাস্টোডিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে ব্র্যাক ব্যাংক। রেইসের তথ্য অনুযায়ী, এসব ফান্ডের প্রায় ৭১৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকার সম্পদও নিরাপদ ও অক্ষত থাকার বিষয়টি কাস্টোডিয়ান নিশ্চিত করেছে।

এর ফলে সংশ্লিষ্ট ১০টি মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা মোট প্রায় ১ হাজার ৯৯৭ কোটি ২১ লাখ টাকার সম্পদে কোনো ঘাটতি বা অনিয়ম পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে রেইস।

নিয়ন্ত্রক নীতির প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন

মিউচুয়াল ফান্ড খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে কয়েকজন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিয়ন্ত্রক নীতির প্রভাবের বিষয়টি সামনে এনেছেন। তাদের মতে, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপের কারণে খাতটির কার্যক্রম ও বিনিয়োগকারীদের রিটার্ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তাদের আলোচনায় সাবেক বিএসইসি চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সময়ে চালু থাকা প্রাইস ফ্লোর এবং অতিরিক্ত প্রভিশনিং ব্যবস্থার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এসব নীতির প্রভাব নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে।

মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগকারী আহসান হাবিব বলেন, “নিয়ন্ত্রক সংস্থার অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে মিউচুয়াল ফান্ড খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগে আমরা নিয়মিত ভালো লভ্যাংশ পেতাম। এখন শুধু বাজারই স্থবির নয়, ফান্ড ম্যানেজারদের কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।”

‘সম্পদ নিরাপদ, অপব্যবহারের সুযোগ নেই’

রেইসের হেড অব কমপ্লায়েন্স মামুনুর রশীদ বলেন, তাদের ব্যবস্থাপনায় থাকা প্রায় ১ হাজার ৯৯৭ কোটি ২১ লাখ টাকার বিনিয়োগ সম্পদ নিরাপদ রয়েছে এবং এসব সম্পদ নিয়মিত অডিটের আওতায় থাকে।

তিনি বলেন, “কোনো ধরনের অবৈধ অর্থ স্থানান্তর বা তহবিল অপব্যবহারের ঘটনা ঘটেনি।”

রেইসের দাবি, তাদের তালিকাভুক্ত বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর শতভাগ রেনাটা, গ্রামীণফোন (জিপি) এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (BATBC)-এর মতো ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, অ-তালিকাভুক্ত সব বিনিয়োগও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদনপ্রাপ্ত।

মামুনুর রশীদ বলেন, “এই অপপ্রচারের উদ্দেশ্য হলো গত দুই দশকে অর্জিত আমাদের সুনাম ক্ষুণ্ন করা এবং শেষ পর্যন্ত কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ দখলের পরিবেশ সৃষ্টি করা।”

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো পক্ষের বক্তব্য বা প্রমাণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের বাইরে স্পষ্ট নয়।

লভ্যাংশ বিতরণের তথ্য নিয়ে রেইসের দাবি

রেইসের দাবি, প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাদের ব্যবস্থাপনায় থাকা মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গত তিন বছরেই নগদ লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে ৬০০ কোটি টাকার বেশি।

অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া আরেক হিসাবে বলা হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের পাঁচ বছরে বিনিয়োগকারীদের মোট ৬৮৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং গত ১৭ বছরে মোট ২ হাজার ৮৯ কোটি টাকা লভ্যাংশ বিতরণ করা হয়েছে।

রেইসের ভাষ্য, এসব তথ্য মিউচুয়াল ফান্ড খাতে তাদের লভ্যাংশ বিতরণের অবস্থানকে তুলে ধরে। তবে বিভিন্ন সময়ের হিসাব ও লভ্যাংশের সংজ্ঞা একই কি না, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিবেদন ও ফান্ডভিত্তিক হিসাব পর্যালোচনা প্রয়োজন।

ওয়েবসাইটের তথ্য যাচাইয়ের দাবি

রেইস ম্যানেজমেন্ট বর্তমানে ১২টি মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনা করছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। এসব ফান্ডের বিনিয়োগ পোর্টফোলিও, আর্থিক প্রতিবেদন এবং অন্যান্য তথ্য নিয়মিতভাবে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকাশিত ১২টি ফান্ডের পোর্টফোলিও ও আর্থিক তথ্য পর্যালোচনা করে বড় ধরনের কোনো অসঙ্গতি বা গরমিল পাওয়া যায়নি।

রেইসের দাবি, তাদের ব্যবস্থাপনায় থাকা সম্পদের বড় অংশ পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর প্রায় ৯৭ শতাংশ ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

টক শো ও গণমাধ্যমে অভিযোগ

সম্প্রতি বিভিন্ন টক শো ও গণমাধ্যমে রেইস ম্যানেজমেন্টের বিরুদ্ধে তহবিল ব্যবস্থাপনা, সম্পদ আত্মসাৎ, পারফরম্যান্স এবং লভ্যাংশ প্রদান নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

রেইস এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, তাদের পরিচালিত ফান্ডের সম্পদ অনুমোদিত কাস্টোডিয়ানদের হেফাজতে থাকায় সরাসরি সম্পদ আত্মসাতের সুযোগ নেই।

বর্তমানে রেইস পরিচালিত ১২টি মিউচুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি হিসেবে আইসিবি ও বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি (বিজিআইসি) দায়িত্ব পালন করছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের দাবি, মোট সম্পদের প্রায় ৯৭ শতাংশ অনুমোদিত কাস্টোডিয়ানের নিরাপদ হেফাজতে রয়েছে।

আইসিবি ও ব্র্যাক ব্যাংকের প্রত্যয়ন

রেইসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের পরিচালিত ফান্ডগুলোর সম্পদ আইসিবি ও ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির কাস্টোডিয়াল ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ট্রাস্ট ডিড ও কাস্টোডিয়ান চুক্তির আওতায় এসব সম্পদ নিরাপদ হেফাজতে রাখার বিষয়ে প্রতিষ্ঠান দুটি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছে বলে দাবি করেছে রেইস।

প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রত্যয়নপত্রের রেফারেন্স নম্বর হলো—

  • আইসিবি: ৫৩.১৩.০০০০.০৪৩.৩৩.১৭৩.২৪/৩২৪৪
  • ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি: BBPLC/CCS/190/2026

বিএসইসির আগের পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন

রেইসের দাবি, বিএসইসির পূর্ববর্তী কমিশনের সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নেওয়া কিছু নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ যথাযথ আইনগত ভিত্তি ছাড়াই নেওয়া হয়েছিল এবং তারা বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছিল।

প্রতিষ্ঠানটি আরও দাবি করেছে, ওই সময়ের বিএসইসির কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এবং এসব অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) তদন্ত করেছে।

তবে রেইস নিজেই বলছে, এসব ঘটনা এবং বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ওঠা সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগকে একই বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

‘গুজব আস্থার সংকট তৈরি করছে’

রেইসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, একটি স্বার্থান্বেষী মহল ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গুজব ছড়াচ্ছে। তাদের মতে, এ ধরনের প্রচারণা শুধু প্রতিষ্ঠানের সুনাম নয়, দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সম্পদের স্বচ্ছ হিসাব, নিয়মিত অডিট, কাস্টোডিয়ানের কার্যকর তদারকি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সময়মতো তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ফান্ড ম্যানেজার, ট্রাস্টি ও কাস্টোডিয়ানের মধ্যে দায়িত্ব ও জবাবদিহির সুস্পষ্ট কাঠামো থাকা প্রয়োজন।